এতে পণ্যের দাম আরো বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে সরবরাহ ব্যবস্থা কতটা নাজুক, তা সামনে এসেছে আবারো। মূলত মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকার দীর্ঘ খরার কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে এফটি।
পণ্য পরিবহনবিষয়ক তথ্য ও মূল্য নির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান আর্গাসের তথ্য অনুযায়ী, পানামা খাল, রাইন নদী, লোহিত সাগর ও কৃষ্ণ সাগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোয় জাহাজ চলাচলের ভাড়া রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর কারণ হিসেবে সংস্থাটি ইউরোপ ও লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘস্থায়ী খরার ফলে সৃষ্ট পানির স্বল্পতা ও মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কথা উল্লেখ করেছে।
পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার বিষয়টিও সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহনের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এ পথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ আগে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এ নৌপথ দিয়ে পরিবহন করা হতো। এখন জাহাজগুলোকে বিকল্প পথে যেতে হচ্ছে। ফলে জ্বালানি সরবরাহের পাশাপাশি বৈশ্বিক নৌ-পরিবহন ব্যবস্থায়ও এর প্রভাব পড়ছে।
বেলজিয়ামের জাহাজ পরিবহন কোম্পানি সিএমবি টেকের প্রধান নির্বাহী আলেকজান্ডার স্যাভেরিস এ পরিস্থিতিকে ‘ফ্রেইট রেট বুম’ বা জাহাজ ভাড়ার অস্বাভাবিক উল্লম্ফন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তার মতে, পরিস্থিতি নজিরবিহীন। বেশি পরিবহন ব্যয়ের কারণে অনেক কারখানাকে উৎপাদন বন্ধ করতে হতে পারে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব গত মাসে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা গেছে জ্বালানি পরিবহনে। হরমুজের পর জুলাইয়ে নতুন করে আলোচনায় আসা বাব-এল মান্দেব প্রণালিতে উত্তেজনা বেড়েছে। ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে সৌদি আরবের সংঘাতের কারণে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো এ প্রণালিতে হামলার ঝুঁকিতে রয়েছে। ফলে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে এশিয়ায় তেল পরিবহনের ভাড়া ১০ আগস্ট ব্যারেলপ্রতি রেকর্ড ১৫ ডলার ২২ সেন্টে উঠেছে। ২০০৫ সালে আর্গাস এ ভাড়ার পরিমাপ শুরু করার পর এটিই সর্বোচ্চ।
কৃষ্ণ সাগরেও একই চিত্র। এ পথে ভূমধ্যসাগরে ট্যাংকার পাঠানোর ভাড়া চলতি সপ্তাহে অন্তত ২০০৫ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। অর্থাৎ যুদ্ধের প্রভাব শুধু মধ্যপ্রাচ্যের আশপাশে সীমাবদ্ধ নেই। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে ইউরোপসহ বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথে।
শিপিং খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। পানামা খালে দীর্ঘ সময়ের খরা ও তীব্র এল নিনো আবহাওয়ার কারণে পানির স্তর কমেছে। একই সময় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে এ পথে জাহাজ চলাচলের চাপও বেড়েছে। পানামা খালের দুই ধরনের লক দিয়ে জাহাজ চলাচলের জায়গা পেতে তাই রেকর্ড ভাড়া দিতে হচ্ছে। লক হলো খালের এমন একটি জলকপাট ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে পানির স্তর বাড়িয়ে বা কমিয়ে জাহাজকে এক স্তর থেকে আরেক স্তরে নেয়া হয়। খালের এসব লক ভিন্ন আকারের জাহাজ চলাচলের জন্য ব্যবহার হয়।
আগস্টের শুরুতে পানামা খালের দুই সেট লকের জন্য নির্ধারিত স্লটের দাম যথাক্রমে ১১ ও ২৫ লাখ ডলারে ওঠে। আর্গাসের তথ্য সংরক্ষণ শুরু হওয়ার পর এটিই সর্বোচ্চ।
ইউরোপেও খরার প্রভাব পড়েছে নৌ-পরিবহনে। জার্মানির ভারী শিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাইন নদীর পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে কমে গেছে। ফলে এ নদী দিয়ে বার্জে (পণ্য বহনের জন্য ব্যবহৃত বড় নৌযান) পণ্য পরিবহনের খরচ বেড়েছে। কোলোন, ডুইসবার্গ, ফ্রাঙ্কফুর্ট ও কার্লসরুহে যাওয়ার পথে বার্জ পরিবহনের ভাড়া ২০১২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে।
আর্গাসের ইউরোপীয় ফ্রেইট মূল্য নির্ধারণ বিভাগের প্রধান জন ওলেট পরিস্থিতিকে আরো গুরুতর বলে মনে করেন। তার মতে, নৌ-পরিবহন বাজারে এমন বড় ধরনের বিঘ্ন আর দেখা যায়নি। এমনকি কভিড-১৯ মহামারী ও রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞার প্রভাবকেও ছাড়িয়ে গেছে বর্তমান পরিস্থিতি।